February 14, 2026, 4:07 pm

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
স্বাধীনতার পর দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি থাকলেও কুষ্টিয়ার কোনো আসনে জয় পায়নি জামায়াতে ইসলামী। সেই ধারাবাহিকতায় পরিবর্তন এনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছে দলটি। অপর একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই আসনগুলো ঐতিহাসিকভাবে বেশীরভাগ বিএনপির দখলেই ছিল। পরে আওয়ামী লীগের ২০০৮ থেকে ২০২৪ একক শাসন ব্যবস্থা ও একক নির্বাচনে আসনগুলো দখলে নেয়।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোটগ্রহণ, গণনা ও পোস্টাল ভোট যুক্ত করার পর বেসরকারিভাবে ফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক। এই ফলাফল কেবল নির্বাচনী পরিসংখ্যানের পরিবর্তন নয়; বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে গড়ে ওঠা স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, সামাজিক প্রভাববলয় ও সাংগঠনিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করছে। বিশেষ দেশের প্রধানতম দল বাংলাদেশ আওামী লীগের ক্ষমতা-কাঠামোর পুরোপুরি বাইরে থাকা অবস্থায় এ্ বিজয় কোন ধরনের বার্তা বহন করে তা বিশ্লেষণ হওয়া দরকার।
আসনভিত্তিক ফলাফল ও রাজনৈতিক তাৎপর্য/
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর)/
এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী রেজা আহমেদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৮২ ভোট।
মোট ভোট পড়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫৪৩টি; বৈধ ভোট ২ লাখ ৭৬ হাজার ৬৬৯ এবং বাতিল ভোট ৫ হাজার ৮৭৪টি। ভোটের হার ছিল ৬৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
এ আসনে পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারভিত্তিক নেতৃত্ব এখনো ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ফলে পরিবর্তনমুখী রাজনীতির তুলনায় এখানে ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী রাজনৈতিক প্রবণতাই অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা)/
দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াত প্রার্থী আব্দুল গফুর ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৩ ভোট পেয়ে জয়ী হন; বিএনপি প্রার্থী পান ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮২১ ভোট।
মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৯১১; বৈধ ৩ লাখ ৪১ হাজার ৭১৯ এবং বাতিল ৭ হাজার ১৯২। ভোটের হার ৭২ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দীর্ঘদিনের সংগঠনিক অভিজ্ঞতা, ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের নেটওয়ার্ক এবং তৃণমূলভিত্তিক সামাজিক সম্পর্ক—এই বিজয়ের পেছনে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
কুষ্টিয়া–৩ (সদর)/
জামায়াত মনোনীত মুফতি আমির হামজা ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপি প্রার্থী পান ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৯ ভোট।
মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ২১ হাজার ৩০৩; বৈধ ৩ লাখ ১৬ হাজার ৪০৪ এবং বাতিল ৪ হাজার ৯১৯। ভোটের হার প্রায় ৭৩ শতাংশ।
ধর্মীয় বক্তা হিসেবে সামাজিক পরিচিতি ও সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় প্রভাববলয়—নির্বাচনী সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতে দেখা যায়, কেবল দলীয় রাজনীতি নয়, সামাজিক আস্থা ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রতীকী পুঁজি (ংুসনড়ষরপ পধঢ়রঃধষ)ও ভোটের আচরণে ভূমিকা রাখছে।
কুষ্টিয়া-(খোকসা-কুমারখালী)
জামায়াত প্রার্থী আফজাল হোসেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন; বিএনপি প্রার্থী পান ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ ভোট।
মোট ভোট পড়েছে ৩ লাখ ৮ হাজার ২৬০; বৈধ ৩ লাখ ২ হাজার ৭৭৭ এবং বাতিল ৫ হাজার ৪৮৩। ভোটের হার ৭২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তুলনামূলকভাবে সন্নিকট, যা স্থানীয় ক্ষমতার বহুমাত্রিক বিন্যাস—দলীয় প্রভাব, বিএনপির দলীয় কোন্দল, প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সামাজিক সমর্থনের সমান্তরাল উপস্থিতি প্রকাশ করে।
গণভোটের চিত্র/
জেলার চারটি আসনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৪৮ হাজার ৯৪০ এবং ‘না’ ভোট ২ লাখ ৯১ হাজার ২১০। আসনভেদে ফলাফলেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের স্পষ্ট প্রাধান্য লক্ষ্য করা গেছে, যা সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
ঐতিহাসিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট/
স্বাধীনতার পর থেকে কুষ্টিয়া জেলার সংসদীয় রাজনীতি প্রধানত বৃহৎ জাতীয় দল, পারিবারিক নেতৃত্ব এবং স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। এই কাঠামোয় জামায়াত দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও তৃণমূল সংগঠন, সামাজিক-ধর্মীয় নেটওয়ার্ক এবং বিকল্প রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
এবারের নির্বাচনী ফলাফল সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার একটি দৃশ্যমান রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন, প্রার্থী নির্বাচনে কৌশলগত সমন্বয়, সামাজিক প্রভাববলয়ের পুনর্বিন্যাস, এবং জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন সম্মিলিতভাবে এই ফলাফলকে সম্ভব করেছে।
নতুন রাজনৈতিক বাঁক/
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে কেবল আসনসংখ্যার পরিবর্তন নয়; বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ সময়ের ক্ষমতা কাঠামো, সামাজিক প্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক বৈধতার ধারণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্দেশ করে।
এই পরিবর্তন স্থায়ী রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনধারা, উন্নয়ন রাজনীতি এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির বাস্তব প্রয়োগের ওপর—যা আগামী দিনের কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ঘটেছে দেশের বৃহৎ দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কারনে এক ধরনের ভোট ভিত্তিক রাজনীতি হয়েছে। এই দলের অনেক নেতা-কর্মী বিএনপি ও জামাত দুই দলেই ভোট দিয়ে দিয়েছে। যারা বেশী কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছে তারা এগিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বিএনপির প্রায় প্রতিটি আসনেই দলীয় কোন্দল বিরাজমান ছিল। দলীয় নেতা-কর্মীরা সরাসরিই বিভক্ত-ভোটে অংশ নেয়। যার কারনে প্রতিটি আসনেই বিএনপির ফল বিপর্যয় ঘটে।